সম্প্রতি তামিলনাড়ুর কালপাক্কামে ভারতের প্রথম ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন প্রোটোটাইপ ফাস্ট ব্রিডার রিঅ্যাক্টর (PFBR) চালু হল। পরমাণু শক্তির ক্ষেত্রে আমাদের আত্মনির্ভরতার এটা একটা নতুন মাইলফলক। ভারতের এই পরমাণু অভিযানের রোমাঞ্চকর পথচলা নিয়ে আজকের আলোচনা।
প্রথমে বলি পরমাণু শক্তি ব্যাপারটা কি? কথাটাকে সঠিকভাবে বললে বলা উচিত পরমাণুর কেন্দ্রক বা নিউক্লিয়াসের শক্তি । একটা মৌলের পরমাণু হচ্ছে সেই মৌলের ক্ষুদ্রতম কণা, যার মধ্যে সেই মৌলের সব রাসায়নিক ধর্ম থাকে। অর্থাৎ একটা লোহার পরমাণু হচ্ছে লোহার ক্ষুদ্রতম কণা, যার মধ্যে লোহার সবগুলি রাসায়ানিক ধর্ম আছে। একই কথা সোনা, রূপা, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন ইত্যাদি সব মৌলের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। একটা পরমাণুর ব্যাসার্ধ আমাদের মাথার একটা চুল যত সরু তার থেকেও লক্ষ গুণ ছোট হয়। পরমাণুর প্রায় সব ভর থাকে তার মাঝখানে থাকা অতি ক্ষুদ্র ধনাত্মক তড়িৎযুক্ত নিউক্লিয়াস বা কেন্দ্রকে, যার ব্যাসার্ধ হয় পরমাণুর ব্যাসার্ধেরও লক্ষ গুণ কম। পরমাণুর বাকি অংশটা ফাঁকা থাকে এবং সেখানে ঋণাত্মক তড়িৎযুক্ত ইলেকট্রনরা বিভিন্ন কক্ষপথে থাকে। পরমাণুর নিউক্লিয়াস ধনাত্মক তড়িৎযুক্ত প্রোটন ও তড়িৎনিরপেক্ষ নিউট্রন দ্বারা গঠিত হয়। প্রোটনগুলির মধ্যে বিকর্ষণের ফলে নিউক্লিয়াস ভেঙ্গে যাবার কথা। কিন্তু প্রোটন -প্রোটন ও প্রোটন-নিউট্রনের মধ্যে ক্রিয়াশীল এক প্রবল শক্তিশালী আকর্ষণী বল তাদেরকে সঙ্ঘবদ্ধ করে রাখে। এই প্রবল শক্তিশালী আকর্ষণী বলকে গুরুবল বলে। এই বলই পরমাণু শক্তির উৎস এবং এর ফলে একটা নিউক্লিয়াসের মধ্যে থাকা প্রোটন ও নিউট্রনের মোট ভরের সমষ্টি নিউক্লিয়াসটার মোট ভরের চেয়ে কিছু বেশি হয়। এই ভরের পার্থক্য আইনস্টাইনের বিখ্যাত E=mc2 সূত্র অনুযায়ী শক্তিতে পরিণত হয়ে নিউক্লিয়াসের বন্ধন শক্তিতে পরিণত হয়। নিউক্লিয়াসের এই বিপুল বন্ধনশক্তির কিছু অংশকে গতিশক্তি বা তাপশক্তিতে পরিণত করে আমরা পরমাণু শক্তির ব্যবহারিক প্রয়োগ করি। এখন কিভাবে এই নিউক্লীয় বন্ধনশক্তির কিছু অংশকে ব্যবহারযোগ্য কোন শক্তিতে পরিণত করা যেতে পারে?
১৯৩৮ সালে Otto Hahn ও Fritz Strassmann নামে দুই জার্মান বিজ্ঞানী নিউক্লিয়ার বিভাজন বা ফিসন নামে একটা বিক্রিয়া আবিষ্কার করেন এবং Lise Meitner ব্যাপারটা কি হয়েছে তা ব্যাখ্যা করেন ১৯৩৯ সালে । এই বিক্রিয়ায় নিউট্রন কণিকার সাহায্যে একটা ভারি পরমাণুর কেন্দ্রক বা নিউক্লিয়াসকে মোটামুটি সমান দুই খণ্ডে ভেঙ্গে দেওয়া হয়। খণ্ডদুটির মোট বন্ধনশক্তি মূল ভারি নিউক্লিয়াসটির বন্ধনশক্তির চেয়ে প্রায় ০.১% কম হয় অর্থাৎ মোট ভরের প্রায় ০.১% শক্তিতে পরিণত হয় এবং এই শক্তি খণ্ডদুটির গতিশক্তি বা তাপশক্তি হিসাবে প্রকাশিত হয়। অবশ্যই একটা পরমাণুর নিউক্লিয়াসের বিভাজন বা ফিসন করলে যে শক্তি পাওয়া যায়, তা ব্যবহারিক এককে একেবারেই নগণ্য। কিন্তু এই বিভাজন বিক্রিয়াতে নিউক্লিয়াস ভেঙ্গে শক্তি পাওয়া ছাড়াও কয়েকটি নিউট্রন নির্গত হয়। এই নিউট্রনের সাহায্যে আবার একটা নিউক্লিয়াসকে ভেঙ্গে শক্তি ও আরও নিউট্রন পাওয়া যায় এবং তারা আরও বিভাজন বিক্রিয়া ঘটাতে পারে। অর্থাৎ একটা শৃঙ্খল বিক্রিয়া বা Chain Reaction চলতে থাকে ও শক্তি উৎপাদন হতে থাকে। ১৯৪২ সালে আমেরিকার শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে Enrico Fermi এই নিউক্লিয়ার শৃঙ্খল বিক্রিয়া আবিষ্কার করেন এটাই হচ্ছে বর্তমানে ব্যবহারিকভাবে পরমাণু শক্তি পাবার চাবিকাঠি। যদি এই শৃঙ্খল বিক্রিয়া অনিয়ন্ত্রিত হয়, তবে তা পরমাণু বোমা হয়, আর নিয়ন্ত্রিত হলে হয় পরমাণু চুল্লী বা নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর।
এখন কথা হচ্ছে যে কোন ভারি পরমাণুর নিউক্লিয়াস দিয়েই কি এই নিউক্লিয়ার শৃঙ্খল বিক্রিয়া বা Chain Reaction চালানো সম্ভব? না, তা সম্ভব নয়। ইউরেনিয়াম ও প্লুটোনিয়ামের কিছু আইসোটোপ (235U, 233U, 239Pu ) দিয়েই এই বিক্রিয়া চালানো সম্ভব । তাই এদেরকে পারমানবিক জ্বালানি বলে । আইসোটোপ কাকে বলে এই প্রশ্ন আসবেই। একটা পরমাণুর নিউক্লিয়াসের প্রোটনের সংখ্যা একই রেখে শুধু তার নিউট্রনের সংখ্যা বদলালে পরমাণুর রাসায়নিক ধর্ম সব একই থাকে, শুধু তার ভরের পরিবর্তন হয় । একেই আইসোটোপ বলে। অর্থাৎ 235U ও 233U এর রাসায়নিক ধর্ম খনিজ ইউরেনিয়াম ( প্রধানত 238U) এর সাথে একই, শুধু এদের ভর আলাদা । খনিজ ইউরেনিয়ামের মধ্যে মাত্র ০.৭% 235U থাকে , আর 233U একেবারেই থাকে না । পারমানবিক চুল্লীর জ্বালানি সাধারণত হয় 235U, তাই তার জন্য অনেক খনিজ ইউরেনিয়ামের সরবরাহ থাকতে হবে ।
ভারতের পরমাণু শক্তির পথচলা
ভারতের পথচলা শুরু হয় ১৯৪৮ সালে Atomic Energy Commission স্থাপনের মধ্যে দিয়ে । প্রথম Chairman হন Dr. Homi J. Bhabha। ১৯৫৬ সালে U. K. থেকে ইউরেনিয়াম -২৩৫ এনে বম্বেতে চালু হয় Apsara নামে ভারতের প্রথম রিসার্চ রিঅ্যাক্টর। তারপর ১৯৬৯ এতে আমেরিকার General Electric Company এর সহযোগিতায় Tarapur Atomic Power Station, যা প্রথম ভারতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ দেয় । ১৯৮৩ এতে তামিলনাড়ুর কালপাক্কামে প্রথম সম্পূর্ণ দেশীয় ডিজাইনে পারমানবিক চুল্লী বানানো হয় এবং তা গ্রিডে বিদ্যুৎ দেয়। বর্তমানে ভারতে মোট ৮৮৮০ MW পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। এটা অবশ্য ভারতের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাত্র ২%। পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদন আরও অনেক বাড়ানোর ক্ষেত্রে সমস্যাটা কি? সমস্যা হচ্ছে আমাদের ইউরেনিয়াম নেই। দেশে ইউরেনিয়ামের খনি খুবই কম, অন্য দেশ থেকে ইউরেনিয়াম আনতে হয়।
Dr. Homi J. Bhabha এই সমস্যাটা বুঝেছিলেন ১৯৬০ সালেই, এবং তিনি এর সমাধানও দিয়ে গেছেন। তবে সমাধান খুব সহজ নয়। ভারতবর্ষে যথেষ্ট ইউরেনিয়াম নেই তা ঠিক, কিন্তু পৃথিবীর মোট থোরিয়ামের ২৫% রয়েছে আমাদের দেশে। তবে থোরিয়াম পারমানবিক জ্বালানি নয়, এটা দিয়ে নিউক্লিয়ার শৃঙ্খল বিক্রিয়া বা Chain Reaction চালানো যায় না। Homi J. Bhabha বললেন নিউট্রনের সাথে বিক্রিয়া ঘটিয়ে খনিজ থোরিয়ামকে (232Th) পারমানবিক জ্বালানি 233U তে পরিণত করা যেতে পারে এবং তা দিয়ে আমাদের অনেক শতাব্দীর শক্তির চাহিদা মিটে যাবে। তিনি ভারতের ৩-স্টেজ নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্রোগ্রামের রূপকার।
প্রথম স্টেজ
খনিজ ইউরেনিয়ামে মাত্র ০.৭% পারমানবিক জ্বালানি ইউরেনিয়াম (235U) থাকে, আর বাকিটা 238U। বিশেষ প্রক্রিয়ায় এই জ্বালানি ইউরেনিয়ামের (235U) সমৃদ্ধকরন করা যায়। তবে তা খরচাসাপেক্ষ এবং ইউরেনিয়াম আমদানি কমানোর জন্য প্রাকৃতিক খনিজ ইউরেনিয়াম ও ভারি জল ব্যবহার করে পারমানবিক চুল্লী গড়ে তোলা হয়। ভারি জল মানে হাইড্রোজেনের আইসোটোপ (2H) ব্যবহার করে তৈরি জল। যেহেতু সাধারণ হাইড্রোজেন (1H) ও তার ভারি আইসোটোপের (2H) রাসায়নিক ধর্ম হুবহু এক, তাই ভারি হাইড্রোজেন আইসোটোপ (2H) ব্যবহার করে ভারি জলও বানানো যায়। রাসায়নিক ধর্ম এক হলেও ভারি হাইড্রোজেনের (2H) নিউক্লিয়াসের সাথে নিউট্রনের বিক্রিয়া ভিন্ন রকমের হয়, কারণ এর নিউক্লিয়াসে সাধারণ হাইড্রোজেনের চেয়ে একটা নিউট্রন বেশি থাকে। 2H এর নিউক্লিয়াস অনেক কম নিউট্রন শোষণ করে বলে বিভাজনের শৃঙ্খল বিক্রিয়া চালানোর জন্য নিউট্রন কম পড়ে না।
জল এখানে দুটো কাজ করে । প্রথমত 235U নিউক্লিয়াসের বিভাজনের ফলে উৎপন্ন উচ্চশক্তির নিউট্রন এর গতি কমিয়ে অনেক কম করে দেয় , যাতে ওই কম শক্তির নিউট্রনের আঘাতে 235U নিউক্লিয়াসের বিভাজনের সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। নিউট্রন উচ্চ শক্তির হলে এই বিভাজনের সম্ভাবনা অনেক কম থাকে। মুশকিল হল যে সাধারণ হাইড্রোজেনের নিউক্লিয়াস একটা নিউট্রন শোষণ করে 2H হয়ে যেতে চায় । কিন্তু 2H এর নিউক্লিয়াস অনেকটা পরিতৃপ্ত, তার নিউট্রন শোষণ করার প্রবণতা অনেক কম। যেহেতু প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামে মাত্র ০.৭% পারমানবিক জ্বালানি ইউরেনিয়াম (235U) থাকে, তাই এক্ষেত্রে নিউট্রন ইকনমি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, সেই কারণে ভারি জল ব্যবহার করা হয়। আবার অসুবিধার দিক হচ্ছে ভারি জল বানানোর খরচ অনেক বেশি। তবুও সব মিলিয়ে ভারি জলেতেই সাশ্রয় হয়।
জলের দ্বিতীয় কাজ হল জ্বালানি দণ্ডকে ঠাণ্ডা রাখা এবং সেখান থেকে তাপ নিয়ে বাষ্প তৈরি করা । এই বাষ্প দিয়েই টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয় । এখানেও ভারি জলের সুবিধা বেশি, কারণ এর তাপ পরিবহন ক্ষমতা বেশি। উচ্চ চাপে এই ভারি জলকে ৩০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে তরল রাখা হয় এবং এই ভারি জল জ্বালানি দণ্ড (যেখানে নিউক্লিয়ার বিভাজনের ফলে তাপ তৈরি হচ্ছে ) থেকে তাপ শোষণ করে নিয়ে যায়। তারপর এই উত্তপ্ত ভারি জলের সাহায্যে Heat Exchanger পদ্ধতিতে সাধারণ জলকে (H2O) বাষ্পে পরিণত করে টারবাইন ঘোরানো হয় ও বিদ্যুৎ তৈরি করা হয়।
এখানে একটা প্রশ্ন হচ্ছে যে একটা নতুন রিঅ্যাক্টরে বিভাজন বিক্রিয়া শুরু করার জন্য প্রথম নিউট্রনটা পাওয়া যাবে কোথা থেকে?
নতুন রিঅ্যাক্টর চালু করার জন্য ছোট ছোট ক্যাপসুলে কৃত্রিম নিউট্রন উৎস জ্বালানি দণ্ডের কাছে রাখা হয়। কৃত্রিম নিউট্রন উৎস মূলত দুই ধরনের হয়:
১) আলফা-নিউট্রন উৎস: এখানে একটি আলফা-নিঃসারক (যেমন- এমেরিসিয়াম-২৪১ বা প্লুটোনিয়াম-২৩৯) এবং বেরিলিয়াম মেশানো থাকে। আলফা কণা বেরিলিয়াম নিউক্লিয়াসকে আঘাত করলে নিউট্রন নির্গত হয়।
২) স্বতঃস্ফূর্ত ফিশন সোর্স: ক্যালিফোর্নিয়াম-২৫২ আইসোটোপটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে যথেষ্ট দ্রুত (আয়ুকাল মাত্র কয়েক বছর) বিভাজিত হয়ে যায় ও নিউট্রন নিঃসরণ করে। এটি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী নিউট্রন উৎস যা রিঅ্যাক্টর স্টার্ট-আপের জন্য খুব জনপ্রিয়।
রিঅ্যাক্টর যখন একবার চালু হয়ে যায় এবং কিছুকাল চলে, তখন জ্বালানির ভেতরেই কিছু তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ তৈরি হয় যা নিউট্রন ত্যাগ করে। এছাড়া অ্যান্টিমনি-বেরিলিয়াম সোর্স ব্যবহার করা হয়। রিঅ্যাক্টর চলাকালীন অ্যান্টিমনি তেজস্ক্রিয় হয়ে ওঠে এবং যখন রিঅ্যাক্টর বন্ধ করে আবার চালু করার প্রয়োজন হয়, তখন এই অ্যান্টিমনি থেকে নির্গত গামা রশ্মি বেরিলিয়ামের সাথে বিক্রিয়া করে রিঅ্যাক্টরের স্টার্ট-আপ নিউট্রন দেয়।
শক্তি উৎপাদন করা ছাড়াও এই চুল্লীতে খনিজ প্রধান ইউরেনিয়াম আইসোটোপ 238U এর সাথে ধীর গতি নিউট্রনের বিক্রিয়ার ফলে পারমানবিক জ্বালানি 239Pu তৈরি হয়। অবশ্যই এই প্লুটোনিয়াম -২৩৯ কে রাসায়নিকভাবে পৃথক করা একটা জটিল ব্যাপার এবং নিউট্রনের সংখ্যা কম থাকে বলে খুব বেশি তৈরিও হয় না । তবুও এই ভাবেই আমাদের প্লুটোনিয়াম -২৩৯ এর একটা ছোট ভাণ্ডার গড়ে উঠেছে এবং একেই পরবর্তী পর্যায়ে ব্যবহার করা হয় ।
দ্বিতীয় স্টেজ
পরের ধাপ হচ্ছে ফাস্ট ব্রিডার রিঅ্যাক্টর এবং এরই প্রোটোটাইপ সম্প্রতি তামিলনাড়ুর কালপাক্কামে চালু হয়েছে । এখানে জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে প্রথম পর্যায়ে পাওয়া 239Pu ও প্রাকৃতিক 238U এর মিশ্রণ (অক্সাইড যৌগ হিসাবে)। এখানে নিউট্রনকে ধীর গতি করানো হয় না, কারণ এখানে নিউট্রনের সংখ্যা বেশি রাখা জরুরি, যাতে 238U থেকে যথেষ্ট পরিমাণে জ্বালানি (239Pu) বানানো যায়। এই চুল্লীতে উচ্চ শক্তির নিউট্রন দিয়ে আঘাত করে 239Pu এর বিভাজন ঘটানো হয় এবং বিভাজনের পরে তিনটি উচ্চ শক্তির নিউট্রন পাওয়া যায় । এর মধ্যে একটা নিউট্রন দিয়ে পরবর্তী বিভাজন ঘটানো হয় এবং বাকি দুইটি নিউট্রন 238U কে 239Pu পরিণত করার কাজে লাগে। ফলে চুল্লীতে যত প্লুটোনিয়াম -২৩৯ ব্যবহৃত হয় , তার থেকে বেশি প্লুটোনিয়াম -২৩৯ তৈরি হয় । এই জ্বালানি বানানোই ব্রিডার রিঅ্যাক্টরের একটা অন্যতম উদ্দেশ্য । যেহেতু এই চুল্লীতে নিউট্রনের গতিবেগ কমানো যাবে না, তাই coolant হিসাবে জল ব্যবহার করা যায় না। এখানে তরল সোডিয়াম ব্যবহার করা হয়। সোডিয়াম নিউট্রনের গতিবেগ কমায় না এবং একটা খুব ভাল coolant। তবে এই উত্তপ্ত তরল সোডিয়াম বাতাস বা জলের সংস্পর্শে এলেই আগুন ধরে যায় এবং বিস্ফোরণ হতে পারে । তাই বিশেষ সতর্কতা ব্যবহার করে এই তরল সোডিয়াম দিয়ে কেবলমাত্র জ্বালানি দণ্ডগুলিকে ঠাণ্ডা করা হয় । নিউট্রনের সাথে সংঘাতে এই সোডিয়াম তেজস্ক্রিয় হয়ে যায়। তাই বিশেষভাবে সিল করে রাখা হয়। এর বাইরে থাকে সাধারণ তরল সোডিয়াম (যা তেজস্ক্রিয় নয় ) এবং Heat exchanger পদ্ধতিতে এই বাইরের তরল সোডিয়ামকে উত্তপ্ত করা হয় এবং এর সাহায্যে আবারও Heat exchanger পদ্ধতিতে সাধারণ জলকে বাষ্পে পরিণত করে টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়।
বর্তমানে প্রোটোটাইপ বানানো হয়েছে মাত্র। এর পরে জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার করা হবে 239Pu ও প্রাকৃতিক 232Th। এই প্রাকৃতিক থোরিয়াম (232Th) ভারতে প্রচুর পরিমাণে আছে। সেখানে উচ্চ শক্তির নিউট্রনের সাথে 232Th এর বিক্রিয়ায় পারমানবিক জ্বালানি 233U তৈরি হবে। 233U প্রাকৃতিক খনিজ সম্পদ হিসাবে পাওয়া যায় না , কারণ এর অর্ধআয়ুষ্কাল এক লক্ষ বছরের কিছু বেশি, তাই বর্তমানে পৃথিবীতে কিছু অবশিষ্ট নেই। এই ভাবে দ্বিতীয় পর্যায়ে আমরা 233U এর ভাণ্ডার গড়ে তুলব । অবশ্যই এই দ্বিতীয় পর্যায়ের ব্রিডার চুল্লীতে তরল সোডিয়ামকে coolant হিসাবে ব্যবহার করতে হবে এবং 233U কে রাসায়নিক পদ্ধতিতে আলাদা করা জটিল ও বিশেষ সাবধানতার সাথে করতে হবে, কারণ তেজস্ক্রিয়তার সমস্যা আছে ।
তৃতীয় স্টেজ
আমাদের হাতে প্রাথমিকভাবে 233U যথেষ্ট পরিমাণে এসে গেলে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে যাবো। এই স্টেজে 233U ও প্রাকৃতিক খনিজ থোরিয়াম (232Th) এর মিশ্র জ্বালানি ব্যবহার করা হবে। প্রকৃতির একটা আশীর্বাদ হচ্ছে যে ধীর গতির নিউট্রন দিয়ে 233U নিউক্লিয়াসের বিভাজন ঘটালেও যথেষ্ট সংখ্যক নিউট্রন পাওয়া যায় এবং তা পরবর্তী পর্যায়ে বিভাজন ঘটানো ছাড়াও থোরিয়াম থেকে যথেষ্ট পরিমাণে 233U উৎপাদন করতে পারে। ফলে এই তৃতীয় পর্যায়ের চুল্লীতে তরল সোডিয়াম ব্যবহার করার দরকার নেই , ভারি জল ব্যবহার করা যেতে পারে। ভারি জলকে ব্যবহার করে তৃতীয় পর্যায়ের চুল্লীর ডিজাইনও ভারতীয় বিজ্ঞানীরা করে ফেলেছেন। অতএব তৃতীয় পর্যায়ে ভারত স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে যাবে। আর কোন পারমানবিক জ্বালানি আমদানি করতে হবে না এবং আমাদের দেশের প্রাকৃতিক থোরিয়াম ব্যবহার করেই পারমানবিক জ্বালানি 233U বানানো যাবে। কয়েক শতাব্দীর শক্তির ভাণ্ডার হাতে এসে যাবে। অধিকন্তু তরল সোডিয়াম ব্যবহারও করতে হবে না , ভারি জল দিয়েই কাজ হবে। অবশ্য 233U কে আলাদা করার রাসায়নিক ও তেজস্ক্রিয় চ্যালেঞ্জটা থাকবে। এই কাজ নিরাপদে করার জন্য robotics ব্যবহার করতে হবে।
এই তিন স্টেজের পরমাণু শক্তির পরিকল্পনায় ভারত অনেকদূর এগিয়েছে। অবশ্যই অনেকে বলেন এই পরিকল্পনা যথেষ্ট জটিল ও খরচাসাপেক্ষ। অন্য বিকল্প উপায়েও তো বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। একটা তুলনা করা যাক। প্রথমে শক্তি ঘনত্বের বিচার করা যাক ।
১. কয়লা (১ কেজি)
তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে সাধারণত উন্নত মানের (বিটুমিনাস বা অ্যানথ্রাসাইট) কয়লা ব্যবহার করা হয়।
• তাপ শক্তি: ১ কেজি কয়লা পোড়ালে গড়ে প্রায় ২৪ মেগাজুল(MJ) তাপ উৎপন্ন হয়।
• বিদ্যুৎ উৎপাদন: একটি সাধারণ তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের দক্ষতা(Efficiency) ৩৫% থেকে ৪০% হয়ে থাকে। বাকি তাপ পরিবেশে নষ্ট হয়।
• চূড়ান্ত হিসাব: ১ কেজি কয়লা থেকে আমরা বাস্তবে ব্যবহারযোগ্য বিদ্যুৎ পাই প্রায় ২.২ থেকে ২.৫ ইউনিট (kWh)।
• (তুলনার জন্য: এই ২.৫ ইউনিট দিয়ে একটি এসি হয়তো দেড় থেকে দুই ঘণ্টা চলবে)।
২. পারমাণবিক জ্বালানি (১ গ্রাম 239Pu বা 233U)
এখানে শক্তির উৎস রাসায়নিক নয়, বরং নিউক্লীয় বিভাজন বা ‘ফিশন’।
• তাপ শক্তি: হিসাব করলে দেখা যায়, পুরো ১ গ্রাম জ্বালানি সম্পূর্ণ ফিশন হলে বা বিভাজিত হলে (closed fuel cycle ধরে) প্রায় ২৪,০০০ কিলোওয়াট-আওয়ার তাপ উৎপন্ন হয়।
• বিদ্যুৎ উৎপাদন: ফাস্ট ব্রিডার (FBR) ও অন্যান্য চুল্লির গড় দক্ষতা ৩৩% ধরলে, উৎপাদিত বিদ্যুতের পরিমাণ দাঁড়ায়: প্রায় ৭৫০০ ইউনিট বা কিলোওয়াট -আওয়ার।
৩. সৌর শক্তি (বাস্তবসম্মত বিশ্লেষণ)
সৌর শক্তির ক্ষেত্রে ভর বা ওজনের কোনো হিসাব নেই। এখানে পরিমাপ করতে হয় ‘ক্ষেত্রফল’ এবং ‘সময়’ দিয়ে।
• সূর্যালোক: ভারতে ১ বর্গমিটার জায়গায় সারাদিনে গড়ে ৫ ইউনিট সমপরিমাণ সৌরশক্তি এসে পড়ে।
• বিদ্যুৎ উৎপাদন: বর্তমানে বাজারে থাকা ভালো মানের সোলার প্যানেলের দক্ষতা গড়ে ২০%। অর্থাৎ, ১ বর্গমিটার সোলার প্যানেল থেকে সারাদিন কড়া রোদ পেলে আমরা বিদ্যুৎ পাব মাত্র ১ ইউনিট।
অর্থাৎ ৭৫০০ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে প্রয়োজন হবে –
মাত্র ১ গ্রাম পারমানবিক জ্বালানি (233U বা 239Pu), যাকে একটা বোতামের চেয়েও ছোট জায়গায় রাখা যায়। অবশ্যই দীর্ঘ আয়ুকালের পারমানবিক তেজস্ক্রিয় বর্জ্য তৈরি হবে , তবে তাকেও বোতামের চেয়ে ছোট জায়গায় রাখা যাবে এবং তার চারিদিকে শিল্ড দেওয়া যাবে।
অথবা
৩০০০ কেজি কয়লা যা একটা ট্রাকে করে আনতে হবে এবং তা পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে প্রচুর বায়ুদূষণ হবে।
অথবা
১.৮ একর ফাঁকা মাঠ (একটা বড় ফুটবল মাঠের সমান ) যা সোলার প্যানেল দিয়ে ভরা থাকবে ও সারা দিন প্রবল সূর্যালোক পাবে। এক্ষেত্রে অনেক সামাজিক সমস্যা হবে ।
এছাড়া অবশ্যই খরচের হিসাব আছে । ভারতের তিন স্টেজের পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্প খুবই capital intensive এবং দীর্ঘ গবেষণা ও উন্নয়নের প্রয়োজন আছে। তেমনি এই প্রকল্প অনেক শতাব্দীর জন্য ভারতের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে সক্ষম। খরচের দিক দিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে পরমাণু বিদ্যুতের ইউনিট পিছু খরচ বর্তমানে কয়লা বা গ্যাস থেকে ইউনিট পিছু খরচের প্রায় সমান হয়।
শেষ বিচারে দেখলে আগামী ১০০ বছরে আমাদের কয়লা, সৌরশক্তি , পরমাণু বিদ্যুৎ সব কিছুরই প্রয়োজন আছে। সৌরশক্তি অবশ্যই আমাদের ভবিষ্যতের জন্য দরকারি এবং পরিবেশবান্ধব। কিন্তু যখন কোনো মেগাসিটি, বুলেট ট্রেন বা ভারী শিল্পের জন্য কোটি কোটি ইউনিট নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়, তখন শক্তির ঘনত্বের বিচারে পারমাণবিক শক্তির কাছাকাছি আসার মতো কোনো বিকল্প আজ পর্যন্ত বিজ্ঞানের হাতে নেই।
কলমে
অধ্যাপক অম্লান রায়
ভেরিএবল এনার্জি সাইক্লোট্রন সেন্টার (VECC), কলকাতা