এই আলোকিত বিশ্বের সাথে আমাদের পরিচয় জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি। আলোর সাহায্যেই আমরা দেখি ও চলাফেরা করি। তবে অবশ্যই আলোকে আমরা দেখি না। আলোকিত কোন বস্তু থেকে আলোকরশ্মি আমাদের চোখে এসে পড়ে দেখার অনুভূতি সৃষ্টি করে ও তখন আমরা সেই আলোকিত বস্তুটিকে দেখি।
মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের বিজ্ঞান বইতে আজকাল আলো নিয়ে অনেক কিছুই পড়ানো হয়। আলো যে এক ধরনের শক্তি, তা পড়ানো হয়। আলোর প্রতিফলন, প্রতিসরণ, ব্যতিচার, বিবর্তন, তড়িৎচুম্বকীয় তত্ত্ব , আলোকবৈদ্যুতিক ক্রিয়া, কোয়ান্টাম মেকানিক্স – এই সবই স্কুলের উচ্চমাধ্যমিক স্তরেই আজকাল পড়ানো হয়। কিন্তু তারপরেও এই চির-পরিচিত আলোর স্বরূপ নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায় অনেকের মনেই। একটা আলোককণা বা ফোটনকে কখনো একটা নির্দিষ্ট পথে যেতে দেখি, ঠিক একটা বস্তুকণার মত। আবার কখনো সে একই সাথে দুটি পথে যায়, ঠিক তরঙ্গের মত। তাহলে আলোকরশ্মি কণার প্রবাহ না তরঙ্গ? বোধহয় কয়েক হাজার বছর ধরে এই নিয়ে আলোচনা চলছে। এই দীর্ঘ দার্শনিক চিন্তা-ভাবনাই জন্ম দিয়েছে আধুনিক কোয়ান্টাম প্রযুক্তির।
আলো নিয়ে গবেষণার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অনেক প্রাচীন। ইরাকি আরবি বিজ্ঞানী ইবান আল-হ্যাথাম ১০২১ খ্রিস্টাব্দে তাঁর লেখা ‘কিতাব আল- মানাজির’ নামে বইতে সম্ভবত প্রথম আলোকরশ্মির প্রতিফলন ও প্রতিসরণের নিয়মগুলি লিখেছিলেন। ওলন্দাজ বিজ্ঞানী উইলব্রেড স্নেল ১৬২১ খ্রিস্টাব্দে আলোর প্রতিসরণের নিয়মগুলি সম্ভবত নিরপেক্ষভাবে পুনরায় আবিষ্কার করেন। ফরাসীরা মনে করেন ১৬৩৭ খ্রিস্টাব্দে ফরাসী বিজ্ঞানী রেনে দেকার্ত প্রতিফলন ও প্রতিসরণের নিয়মগুলি আবারও নিরপেক্ষভাবে আবিষ্কার করেন এবং ইউরোপে তিনি প্রথম এই সূত্রগুলি বই আকারে প্রকাশ করেন।
আলোর স্বরূপ নিয়ে প্রাচীনকাল থেকেই ভারতীয়, গ্রিক, বৌদ্ধ দার্শনিকরা এবং অবশ্যই আরবি বিজ্ঞানী ইবান আল-হ্যাথাম ও তাঁর সহযোগীরা ভেবেছিলেন। নবদ্বীপের পণ্ডিতেরা এবং বাংলার মুসলিম সুফি দার্শনিকেরাও আলোর স্বরূপ নিয়ে ভেবেছিলেন। তবে প্রাচীন চিন্তায় সবাই আলোকে উচ্চ গতিশীল কণার প্রবাহ হিসাবে দেখেছিলেন, কারণ আলো সরলরেখায় যায় এবং ছায়ার সৃষ্টি করে।
১৬৭৫ খ্রিস্টাব্দে স্যার আইজাক নিউটন আলোকরশ্মিকে আলোককণার প্রবাহ হিসাবে ভাবেন এবং প্রায় একই সময়ে ওলন্দাজ বিজ্ঞানী ক্রিশ্চিয়ান হাইগেনস আলোর তরঙ্গ তত্ত্বের প্রস্তাব দেন। নিউটনের সময় জানা ছিল যে বাতাস থেকে স্বচ্ছ কাঁচে আলো পড়লে তার মাত্র ৪% প্রতিফলিত হয় ও ৯৬% প্রতিসৃত হয়ে কাঁচের ভিতর ঢোকে। নিউটন ও সমসাময়িক অনেক বিজ্ঞানী প্রশ্ন তুললেন যে অভিন্ন আলোককণাগুলি কেন কেউ কেউ প্রতিফলিত হবে, আর বাঁকিরা প্রতিসৃত হবে? একটা আলোককণা জানবে কেমন করে যে তাকে প্রতিফলিত হতে হবে, না প্রতিসৃত হতে হবে? যদি ধরে নিই যে আলোককণাগুলি ঠিক অভিন্ন নয় এবং তাদের আভ্যন্তরীণ গঠনের কিছু পার্থক্যের জন্য এই রকম হচ্ছে, তাহলে আলোর উৎস ও প্রতিফলক কাঁচের মধ্যে আরেকটি কাঁচ রেখে এই তত্ত্বের সত্যতা পরীক্ষা করা যায়। দেখা গেল যে মাঝখানে যতগুলি কাঁচই রাখা হোক না কেন, সব কাঁচ থেকেই আলো ৪% প্রতিফলিত ও ৯৬% প্রতিসৃত হয়। কাজেই আলোককণার আভ্যন্তরীণ গঠনের তত্ত্ব সঠিক হতে পারে না।
আলোকরশ্মির আংশিক প্রতিফলন ও প্রতিসরণ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে করতেই নিউটন একটা সমতল কাঁচের প্লেটের উপর একটা লেন্স (যার একদিক উত্তল ও অন্যদিক সমতল) রেখে তাঁর বিখ্যাত নিউটনের আংটি দেখেন। তিনি দেখেন লেন্সে প্রতিসৃত হয়ে কাঁচের প্লেট দ্বারা প্রতিফলিত আলোকরশ্মি এবং লেন্স দ্বারা পূর্ণ প্রতিফলিত আলোকরশ্মি মিলিত হয়ে পরপর বৃত্তাকার উজ্জ্বল ও অন্ধকারাচ্ছন্ন বলয় তৈরি করে। এই হল নিউটনের আংটি (১ নং ছবি)। তখনো আলোর ব্যতিচার জানা ছিল না। তবে এই পরীক্ষার ফলাফল আলোককণা দিয়ে বোঝা নিউটনের পক্ষে খুবই কঠিন ছিল। এই সময় নিউটনের আলোকসংক্রান্ত অনেক কাজ একটা দুর্ঘটনায় পুড়ে যায়। যাই হোক এই সমস্যার সমাধান নিউটন করে যেতে পারেন নি। তবে যত দূর জানা আছে, নিউটন জীবনের শেষ পর্যন্ত আলোককণার অস্তিত্বেই বিশ্বাসী ছিলেন এবং আলোর তরঙ্গবাদ মানেন নি।

এর অনেক পরে ১৮০২ সালে থমাস ইয়ং আলোর ব্যতিচার ধর্মের পরীক্ষামূলক প্রমাণ দেন এবং ১৮৬৪ সালে জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল আলোর তড়িৎচুম্বকীয় তত্ত্ব দেন। ম্যাক্সওয়েল বলেন যে আলো উচ্চ কম্পাঙ্কের তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ , অর্থাৎ তড়িৎক্ষেত্র ও চৌম্বক ক্ষেত্রের তরঙ্গ। অবশ্য দৃশ্যমান আলোর তরঙ্গদীর্ঘ মাত্র ৩৮০ – ৭৫০ ন্যানোমিটার , যেখানে এক ন্যানোমিটার হছে এক সেন্টিমিটারের এক কোটিভাগের এক ভাগ।কাজেই আলোর তরঙ্গদীর্ঘ আমাদের মাথার একটা চুল যত সরু, তারও দশ ভাগের এক ভাগ মতন। আলোর তরঙ্গের সাহায্যেও প্রতিফলন , প্রতিসরণের ব্যাখ্যা দেওয়া যায়। এছাড়া রেডিওওয়েভ , মাইক্রোওয়েভ হচ্ছে ভিন্ন কম্পাঙ্কের তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ (অনেক বেশি তরঙ্গদীর্ঘ এর) এবং এদের সাহায্যে বেতারে যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।
এর পরে ১৮৮৭-১৯০৫ সালে আলোক-তড়িৎ ক্রিয়া আবিষ্কৃত হল এবং আলবার্ট আইনস্টাইন আলোক রশ্মিকে ফোটন কণার প্রবাহ ধরে তার ব্যাখ্যা দেন। আলোক-তড়িৎ ক্রিয়াতে দেখা গেল যে আলোকরশ্মি লিথিয়াম, সিসিয়াম, সোডিয়াম ইত্যাদি ধাতুর উপর পড়লে ঋণাত্মক তড়িৎযুক্ত ইলেকট্রন কণা বেরিয়ে আসে। নির্গত ইলেকট্রনের শক্তি ও আপতিত আলোর কম্পাঙ্কের মধ্যে যে সম্পর্ক পরীক্ষায় দেখা গেল, তা আলোর তরঙ্গধর্ম দিয়ে ব্যাখ্যা করা গেল না। এছাড়া কৃষ্ণ বস্তু থেকে বিকিরিত আলোর বর্ণালীও আলোর তরঙ্গবাদ ব্যাখ্যা করতে পারলো না। প্রয়োজন হল আলোকে ফোটন কণার সমষ্টি হিসাবে ভাবার। তবে এই ফোটন কণা আবার আমাদের চেনা সাধারণ কণা নয়। ফোটন কণার সাথে একটা কম্পাঙ্ক ও তরঙ্গদৈর্ঘ্য যুক্ত করা হল। একটা ফোটন কণার শক্তি হচ্ছে তার কম্পাঙ্ক গুণ একটা ধ্রুবক, যাকে প্ল্যাঙ্কের ধ্রুবক বলা হয়। অর্থাৎ ব্যাপারটা দাঁড়ালো যে আলো ফোটন কণার সমষ্টি , তবে এই কণার তরঙ্গধর্মও আছে। সোজা কোথায় আলো কণাও বটে, আবার তরঙ্গও, তার দ্বৈত চরিত্র।
আলো নিয়ে আরও গবেষণা
আলোর ব্যতিচারের পরীক্ষায় আবার ফিরে যাওয়া যাক। ২ নং ছবিতে আলোর ব্যতিচারের একটা পরীক্ষা দেখানো হয়েছে। S1 পর্দায় একটা ছোট ছিদ্র ‘a’ হচ্ছে আলোর উৎস । আলোকরশ্মি S2 পর্দায় দুটো ছোট ছিদ্র ‘b’ ও ‘c’ এর মধ্যে দিয়ে গিয়ে F পর্দায় মিলিত হয় ও সেখানে আলোকিত ও অন্ধকারাচ্ছন্ন ফ্রিঞ্জ দেখা যায় (২ নং ছবি)। এক্ষেত্রে জানার উপায় নেই যে উৎস ‘a’ থেকে নির্গত হয়ে আলোককণা অর্থাৎ ফোটন কণাটি ‘b’ বা ‘c’ কোন ছিদ্রের মধ্যে দিয়ে গিয়ে F পর্দায় মিলিত হয়েছে।

এখন ধরা যাক উৎস ‘a’ থেকে নির্গত আলোর প্রাবল্য খুব কমিয়ে আনা হল, যাতে সেকেন্ডে গড়ে একটিমাত্র ফোটন উৎস থেকে নির্গত হয়। তাহলে একটি ফোটন হয় ‘b’ ছিদ্রের মধ্যে দিয়ে নয়তো ‘c’ মধ্যে দিয়ে গিয়ে F পর্দায় পৌঁছবে। তাহলেও কি পর্দায় ফ্রিঞ্জ দেখা যাবে? হ্যাঁ, দেখা যায়। যদি জানা না থাকে যে ফোটন কোন ছিদ্রের মধ্যে দিয়ে যেতে পারে (‘b’ না ‘c’) এবং উৎস ‘a’ থেকে সেকেন্ডে একটি করে ফোটন নির্গত হতে থাকে, তাহলেও F পর্দায় ধীরে ধীরে ব্যতিচার ফ্রিঞ্জ ফুটে উঠবে। অতএব একটা ফোটন কণা নিজেই নিজের সাথে ব্যতিচার করে ফ্রিঞ্জ গঠন করে, কারণ সে একটি তরঙ্গ যা দুটি ছিদ্র (‘b’ ও ‘c’ ) দিয়েই যেতে পারে।
এইবার ধরা যাক আমি কোন যন্ত্রের সাহায্যে জানার চেষ্টা করলাম ফোটন কণা ‘b’ না ‘c’ কোন ছিদ্রের মধ্যে দিয়ে গেছে। দেখা গেল আমি যদি আগেই জানতে পারি যে ফোটন কণাগুলি কোন পথে অর্থাৎ কোন ছিদ্রের মধ্যে দিয়ে গিয়ে F পর্দায় পৌঁছেছে, তাহলে আর পর্দায় ব্যতিচার ফ্রিঞ্জ দেখা যায় না। তার বদলে বর্ধিত ‘ab’ সরলরেখা যেখানে F পর্দায় পৌঁছয় এবং বর্ধিত ‘ac’ সরলরেখা যেখানে F পর্দায় পৌঁছয়, সেই দুটি স্থানে আলোকিত বিন্দু দেখা যাবে। অর্থাৎ ফোটন কোন পথে গেছে জানতে পারলে তার তরঙ্গ ধর্ম বিলুপ্ত হয়ে কণা ধর্ম দেখা দেয়।
কোয়ান্টাম মেকানিক্স কী বলে?
কোয়ান্টাম মেকানিক্স বলে যে এই দ্বৈত ধর্ম (কণা ও তরঙ্গ ধর্ম) শুধু আলোককণা ফোটনের নয়; ইলেকট্রন, প্রোটন, পরমাণু, অণু, এমনকি ধূলিকণার ক্ষেত্রেও এই ধর্ম প্রযোজ্য। অর্থাৎ তরঙ্গ-কণা দ্বৈততা প্রকৃতির সব বস্তুকণারই একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য।
কিন্তু এই দ্বৈত ধর্মের উৎপত্তি কেন? এর উত্তরে কোয়ান্টাম মেকানিক্স অনিশ্চয়তা নীতির কথা বলে। কোনো বস্তুকণার অবস্থান যদি খুব নির্ভুলভাবে জানা যায়, তাহলে তার ভরবেগ (ভর X গতিবেগ ) সম্পূর্ণ অনিশ্চিত হয়ে যায়। আবার ভরবেগ নির্ভুলভাবে জানা থাকলে তার অবস্থান অনিশ্চিত হয়ে যায়। তরঙ্গের গতিবিদ্যা থেকে জানা যায়, ভরবেগ কম্পাঙ্কের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই কোনো কণার অবস্থান নির্দিষ্ট হলে তাকে বহু কম্পাঙ্কের তরঙ্গের সমন্বয় হিসেবে বর্ণনা করতে হয়। অন্যদিকে নির্দিষ্ট ভরবেগ মানে একটি নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কের তরঙ্গ, যার কোনো নির্দিষ্ট অবস্থান থাকে না। এই কারণেই পরীক্ষার ধরন অনুযায়ী একই বস্তু কখনো কণার মতো, আবার কখনো তরঙ্গের মতো আচরণ করে।
তবে ভরবেগ যত বেশি হয়, তরঙ্গদৈর্ঘ্য তত ছোট হয় এবং ব্যতিচারের মতো তরঙ্গধর্ম পর্যবেক্ষণ করা তত কঠিন হয়ে পড়ে। দৃশ্যমান আলোর ফোটনের ভরবেগ সাধারণত ইলেকট্রন, প্রোটন বা পরমাণুর তুলনায় অনেক কম। তাই আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য তুলনামূলকভাবে বড় এবং তার ব্যতিচার সহজে দেখা যায়। আবার আলোর কণাধর্মও স্পষ্টভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায়। সেই কারণেই তরঙ্গ-কণা দ্বৈততার অধিকাংশ পরীক্ষা আলো নিয়েই করা হয়েছে।
এরপর কি হল?
কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অনিশ্চয়তা নীতি তো ভালোভাবেই আলোর দ্বৈত ধর্মের ব্যাখ্যা দেয়। কিন্তু কৌতূহলী মানব মনের প্রশ্ন এখানেই শেষ হয় না। প্রশ্ন থাকে যে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অনিশ্চয়তা নীতি কতদূর সত্য? আইনস্টাইন তো কোনদিনই এই অনিশ্চয়তা নীতিকে শেষ কথা বলে মানেন নি। তাঁর মতে আমরা না জানলেও বস্তুকণার অবস্থান ও ভরবেগের যুগ্ম বাস্তব অস্তিত্ব নিশ্চয় আছে। তবে আইনস্টাইন অনেক চেষ্টা করেও তাঁর এই বিশ্বাসের স্বপক্ষে কোন প্রমাণ জোগাড় করতে পারেন নি। শুধু বলেছিলেন, ঈশ্বর এই রকম অনিশ্চিত কিছু করতে পারেন না। আর উত্তরে নিলস বোর বলেছিলেন, ঈশ্বরের কি করা উচিত, সেই বিষয়ে আপনি পরামর্শ দেওয়া বন্ধ করুন।
কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অনিশ্চয়তা নীতিকে আরও কঠোরভাবে পরীক্ষা করার জন্য আলোর কোয়ান্টাম ধর্ম নিয়ে আরও গবেষণা চলতে লাগল। ১৯৭৮ সালে John Archibald Wheeler বিলম্বিত পছন্দের পরীক্ষা (Delayed Choice Experiment)-এর প্রস্তাব দেন। তাঁর প্রশ্ন ছিল, আলোর ব্যতিচার পরীক্ষায় ফোটন কোন পথে গিয়েছিল, তা যদি পরে জানা সম্ভব হয়, তাহলেও কি ব্যতিচার ফ্রিঞ্জ দেখা যাবে? অর্থাৎ ভবিষ্যতের জ্ঞান কি অতীতকে প্রভাবিত করতে পারে? ১৯৮২-১৯৯৯ সালে এই ধরনের পরীক্ষা পরীক্ষাগারে সম্পন্ন হয়। আরও আধুনিক পরীক্ষা শুরু হয় ২০১০ সালের পরে এবং এখনও চলছে। এই সব পরীক্ষায় দেখা গেছে, ফোটন পর্দায় পৌঁছানোর আগে যদি কোন পথে গিয়েছিল তা জানা সম্ভব না হয়, তাহলে পর্দায় অবশ্যই ব্যতিচার ফ্রিঞ্জ দেখা যায়। পরে সেই তথ্য জানা সম্ভব হলেও আগের ফলাফল বদলায় না। অর্থাৎ কোয়ান্টাম মেকানিক্স সঠিক এবং ভবিষ্যতের পর্যবেক্ষণ বা জ্ঞান কোনোভাবেই অতীতকে প্রভাবিত করে না। তবে পরীক্ষায় দুটি ধরনের তথ্য আলাদাভাবে রেকর্ড করা যায়—একদিকে প্রতিটি ফোটন পর্দার কোথায় এসে পড়ল, অন্যদিকে কোন পথে ফোটন গিয়েছিল তা জানার সম্ভাবনা। পরে যদি এই দুটি তথ্য মিলিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়, তাহলে ব্যতিচার ফ্রিঞ্জ আর দেখা যায় না; আলোর কণাধর্ম প্রকাশ পায়। আবার উল্টো ব্যবস্থাও করা যায়। ধরা যাক, প্রথমে এমন ব্যবস্থা করা হয়েছিল যাতে ফোটন কোন পথে গিয়েছিল তা জানা সম্ভব ছিল এবং তাই ব্যতিচার ফ্রিঞ্জ দেখা যায়নি। পরে যদি সেই পথ-সংক্রান্ত তথ্য ব্যবহার না করে একই রেকর্ড করা তথ্য পুনরায় বিশ্লেষণ করা হয়, তাহলে ব্যতিচার ফ্রিঞ্জ আবার দেখা দেয়। এই ধারণার উপর ভিত্তি করেই Quantum Eraser পরীক্ষা গড়ে উঠেছে। এখানে পরীক্ষার ফল পরিবর্তিত হয় না; পরিবর্তিত হয় কেবল একই পরীক্ষায় সংগৃহীত তথ্যকে কীভাবে বাছাই করে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। কোয়ান্টাম কম্পিউটারের কোয়ান্টাম বিটের(Qubit) ত্রুটি সংশোধন (error correction) করার কাজেও এই ধারণার ব্যবহার নিয়ে কাজ চলছে। বহু স্টার্ট-আপ সংস্থা থেকে শুরু করে IBM Quantum এই কাজের সাথে বর্তমানে যুক্ত আছে। কাজেই আলো নিয়ে মানুষের দীর্ঘ দার্শনিক চিন্তার ফল হিসাবে শুধু যে আজানাকে জানা হয়েছে তাই নয়, এর ভিত্তিতে গড়ে উঠছে ভবিষ্যতের কোয়ান্টাম প্রযুক্তি।
সবশেষে জানাই যে অনেক জনপ্রিয় YOU-TUBE চ্যানেলে Wheeler এর Delayed Choice পরীক্ষাটিকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে তাকে রহস্যময় এবং ধর্মীয় আধ্যাত্মিক করে তোলা হয়। বলা হয় যে কোয়ান্টাম বিজ্ঞানে ভবিষ্যৎ অতীতকে প্রভাবিত করে। বাস্তবে সেই রকম কিছু হয় না। ভবিষ্যতের পর্যবেক্ষণের সাহায্য নিয়ে অতীতের রেকর্ড করা ডেটা পুনরায় বিশ্লেষণ করলে, বর্তমানে নতুন একটি পরীক্ষা করা হয়, অতীতকে বদলে দেওয়া হয় না।
কলমে অধ্যাপক অম্লান রায়
ভেরিএবল এনার্জি সাইক্লোট্রন সেন্টার (VECC), কলকাতা